সব শেষের ও একটা শেষ থাকে যার কথা না লিখলে বড়বাসার কথা অসমাপ্ত থেকে যায়, আজ তার কথা লিখি। সে আর কেউ নয় আমাদের সকলের ছোট বোন সমস্ত রায়গঞ্জ শহরের নয়নের মনি সীমা- মহুয়া ঘোষ। রায়গঞ্জ ছিল ওর প্রাণ আর ও ছিল রায়গঞ্জের প্রাণ। রায়গঞ্জের কোন অনুষ্ঠানে বাজনা বাজাবার জন্য প্রথমেই ডাক পড়ে সীমার। কুলদাকান্ত শীল্ডে সম্মানীয় অতিথিদের সাথে স্থান হতো ওর। সরকারি অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণপত্র হাতে আসতো অহঃরহ।
সীমার ঘরে বসে গান গাইছে সারেগামাপা খ্যাত স্নিগ্ধজিৎ ভৌমিক বা স্টার জলসার সুপার সিঙ্গার প্রতিযোগিতার ফাইনালিস্ট অরবিন্দ কর্মকার সঙ্গে বাজনা বাজাচ্ছে সীমা- ঘটনাগুলো এখনো আমার মোবাইল বন্দি। বোম্বেতে বিশিষ্ট কন্ঠ শিল্পী রানা মজুমদারকে দেখেছি সীমার বিষয়ে কি উচ্ছসিত। উত্তরবঙ্গের নানা স্থানে অনুষ্ঠান করত ও। "সংবাদ প্রতিদিন" খবরের কাগজে ওর বাদ্যরত ছবি দিয়ে খবর ছাপা হয় "ড্রাম বাজিয়ে উত্তরের মন কেড়েছেন সীমা"।
এক বছর বিশিষ্ট শিল্পী ভাতা পায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে। সীমার পেন্সিল স্কেচ এর তুলনা নেই। কিছু আঁকলেই আমাকে পাঠাতো, কিছু পোর্ট্রেট (Portrait) রাখা আছে আমার কাছে সাথে সেই ব্যক্তির ফটো এত অবিকল প্রতিচ্ছবি- ও যে কত বড় মাপের শিল্পী ছিল তার প্রমাণ দেয়। লক্ষ্মী মাতার পটচিত্র হোক বা গণেশ ঠাকুরের wall hanging সযত্নে সংগৃহীত আছে আমার কাছে। ওর খোদাই কাজও ছিল অপূর্ব, মেকআপে হাত পাকিয়ে ছিল ও। দারুণ সাজাতো- সে বিয়ের কনে হোক বা go as you like এর বাচ্চাই হোক। কারো জন্মদিনে কেক বানিয়েছে অপূর্ব। কখনো কেকের হারমোনিয়াম, কখনো বন্দুক, কখনো একগুচ্ছ নানা রঙের ফুল। আনন্দে, বিপদে, দূর্বিপাকে রায়গঞ্জবাসী সর্বদা পাশে পেয়েছে তার প্রাণের প্রিয় সীমাকে।
২০২১ এর ৫ই আগস্ট অসীমের পথে চলে গেল সীমা। রায়গঞ্জ শহর ভেঙে পড়লো সীমার অন্তিম যাত্রায়। ফুল দিয়ে সাজানো সীমার অন্তিম যাত্রার গাড়ির সামনে বড় ব্যানারে লেখা ছিল "চিহ্ন তব পড়ে আছে তুমি হেথা নেই- অন্তিম শ্রদ্ধা"। দূরদর্শনে RC TV সংবাদে সীমাদির প্রস্থান বলে একটি বড় খবর প্রচারিত হয়। বারবার সংবাদপত্র ও দূরদর্শনে জায়গা করে নিয়েছে ও। ১৮ই আগস্ট ভারত সেবাশ্রম সংঘের রায়গঞ্জ শাখায় সীমার পারলৌকিক কাজে উপস্থিত ছিলেন রায়গঞ্জের বহু বিশিষ্টজন। এক মাসের মাথায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রায়গঞ্জবাসী একটি সুসজ্জিত Hall এ।
কবিতা পাঠ হয়- "হাসি নয়, অশ্রু নয়, উদার বৈরাগ্য নয়, বিশাল বিশ্রাম"- আবার সেই অনুষ্ঠানে তুহিন চন্দের লেখা চলে যাবার তো কথাই ছিল না কবিতাটি সকলের মন ছুঁয়ে যায়। ২০২২ এ সাধারণ লোক দরিদ্র নারায়ণ সেবা করে সীমার বাৎসরিক কাজ করে, দুর্গা পূজা ও বিশ্বকর্মা পূজার প্যান্ডেলে সীমার ফটো টানিয়ে ওকে শ্রদ্ধা জানায়। এইসব ছবি দেখে বিস্মিত হই সত্যিই রায়গঞ্জের মানুষ ওকে এত ভালোবাসতো, এত শ্রদ্ধা করতো
সীমা বড়বাসার ঐতিহ্যকে অনেক বড় করে প্রতিষ্ঠা করেছিল রায়গঞ্জ শহরে, এটুকু না লিখলে অপূর্ণ থেকে যেতো বড়বাসার কথা। সীমার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেল বড় বাসার শেষটুকু।