আমার প্রিয় বড় বাসা - বিজয়া ঘোষ।

"বড়বাসা" নামটা শুধু আয়তনের জন্য নয়, ওই নামটা রায়গঞ্জ বাসীর কাছে উচ্চ বংশ মর্যাদা সম্পন্ন, ঐতিহ্যশালী, দানশীল এক বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবারের বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে যৌথভাবে অবস্থার মোকাবিলায়

বড়বাসার সদস্যরা অননুকরণীয় ছিল।
আমার স্মৃতিচারণায় প্রথমেই মনে হয় যার নাম তিনি আর কেউ নন রায়গঞ্জ বড়বাসার প্রতিষ্ঠাতা শ্রীযুক্ত গোবিন্দচন্দ্র ঘোষ মহাশয়। ছোটঠাকুমার (সুনীতি বালা) কাছে শুনেছি উনি একজন সিংহপুরুষ ছিলেন। কাচারিঘরে বিশাল সিংহাসনে বসা ওনার ছবির সামনে স্বাভাবিকভাবেই আমার মাথা শ্রদ্ধায় নত হয়ে যেত। মনে মনে ভাবি এই সেই যিনি জীবিকার টানে নানাস্থান ঘুরে শেষে রায়গঞ্জে স্থিতু হন, প্রথমে উনি বন্দরে ছিলেন পরে উকিলপাড়ায় আসেন। পেশাগত ভাবে গোবিন্দ্রচন্দ্র ঘোষ একজন নামজাদা আইনজীবী ছিলেন। ওকালতি করে প্রচুর ধনসম্পদ ও জমি জায়গার মালিক হন। আজ থেকে আনুমানিক দেড়শ বছর আগে এই বড় বাসা স্থাপিত হয়। বর্তমানে গোবিন্দ চন্দ্র ঘোষ এর ষষ্ঠ প্রজন্ম।

বড়বাসায় আমার অভিজ্ঞতার ইতিহাসে যাওয়ার আগে বাড়ির সবাইকে সম্পর্কের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার সৎ প্রচেষ্টার কারিগর রিন্টু ও তার দুই সহযোগী বুয়া ও বুয়ার ছেলে ঋভুকে সাধুবাদ জানাই।

আমি বিজয়া- গোবিন্দচন্দ্র ঘোষের প্রপৌত্রী ও গোবিন্দচন্দ্র ঘোষের সেজো ছেলে ডাক্তার যামিনী কান্ত ঘোষের পৌত্রি। যামিনী কান্ত ঘোষের বড় ছেলে অশোক রঞ্জন ঘোষ আমার বাবা। কর্মসূত্রে আমার ঠাকুরদা মহাদেবপুর রাজবাড়ীতে পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন উনার শৈশবকাল দিনাজপুরে কেটেছে, যা আজ বাংলাদেশের অংশ, পরে বোম্বে মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করেন। আমার বাবারা দুই ভাই ও তিন বোন। এক বোন ছোট বয়সে মারা যান। দাদু ও বাবারা পরবর্তীকালে রায়গঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আমি, দেবযানী দি, দিদি (শকুন্তলা) ও অমিত এই বাড়িতে জন্মেছি। জেঠিমার (অমলা) কাছে শুনেছি দাদু এ অঞ্চলের নাম করা স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আমার শৈশব থেকে স্কুল কলেজ সবই এই বাড়িতে আনন্দে কেটেছে এই আনন্দের নিরবিচ্ছিন্ন সাথী ছিল আমার প্রাণের বন্ধু ও জ্যাঠতুতো (টাটুম জ্যাঠার মেয়ে) বোন মনা। বাড়ির পিছনে নানা রকম ফল গাছ নিয়ে বাগান ছিল। আমি আর মনা নারকেল দড়ি আম গাছের ডালে বেঁধে দোলনা দুলতাম, দুপুর বেলা রুয়াল গাছের টক ফল পেড়ে নুন দিয়ে খেতাম, আবার দুর্গাপূজার সময় সকালবেলা দুই বন্ধু শিউলি ফুল তুলে পূজার প্যান্ডেলে দিয়ে আসতাম। সামনের মাঠে আমার বন্ধুদের নিয়ে বুড়ি ছোঁয়া, দারিয়াবান্ধা ,এক্কা দোক্কা খেলতাম আর ছিল জ্যাঠতুতো ও খুড়তুতো ভাই-বোনদের দল। আজকের ছোট পরিবার কেন্দ্রিক শহরে জীবনে এই সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাবে না কিন্তু তখন আমাদের তুতো ভাই-বোনদের মধ্যে হৃদ্যতা ছিল অবিচ্ছেদ্য। আজ ভাবি আমি, মনা, কুনাল, অমিত, রিন্টু ও শুভ্র শৈশবেই পিতৃহারা হয়ে এই বড় বাসাতেই কৈশোর কাটিয়েছি ও বড় হয়েছি, এই মিলটা আমাদের বন্ধনকে শক্ত করেছে।

দাদুর মুখে শোনা বাসুদেবের মূর্তি পাওয়ার ঘটনা:-দাদু এক ধনী মুসলমানের বাড়িতে উনার স্ত্রীর প্রসব করাতে গিয়েছিলেন। বাড়ির পাশেই উনার জমিতে পুকুর খোঁড়া হচ্ছিল। ওই মাটি খুঁড়তে গিয়েই কষ্টিপাথরের নিখুঁত বিষ্ণু মূর্তি টি উঠে আসে, এদিকে ব্যক্তিটির পুত্র সন্তান লাভ হয়। ধনী মুসলমান ভদ্রলোক আনন্দ সহকারে দাদুকে মূর্তিটি উপহার দেন। মূর্তিটি বেল গাছের নিচে শান বাঁধানো বেদির উপর প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতি শনিবার জেঠিমা (অমলা) হরির লুট দিতেন, আর আমরা বাতাসা কুড়াতাম। তাছাড়া ছোটঠাকুমা ব্রতকথা পাঠ করতেন। বাসুদেবের মূর্তিটা বাড়ির ভিতর না রেখে কেন বেলতলায় রাখা হয়েছিল সে প্রশ্ন আজ মনে উঠে আসে তখন তো কিছুই বুঝতাম না। বাড়িতে কালী পূজা অনুষ্ঠিত হতো তাই হয়তো বাইরের বেলতলায় বাসুদেবের স্থান হয়েছিল।

আমার বাবা শ্রীযুক্ত অশোক রঞ্জন ঘোষের কথা উল্লেখ না করলে এ লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উনি গভর্নমেন্ট কন্ট্রাক্টর ছিলেন। কাজের জন্য বেশিরভাগ সময়েই বাড়ির বাইরে থাকতেন। উনি পরোপকারী ,ক্রীড়ানুরাগী এবং উদার মনের মানুষ হিসাবে রায়গঞ্জ বাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন। এক সময় পশ্চিম দিনাজপুর জেলা ফুটবল দল শুধুমাত্র বালুরঘাটের ছেলেদের নিয়ে তৈরি হতো। বাবা গাড়ির ব্যবস্থা করে রায়গঞ্জ ও কালিয়াগঞ্জ এর খেলোয়াড়দের বালুরঘাটে ট্রায়ালে পাঠিয়ে জেলা দলে খেলার ব্যবস্থা করেন।( রিন্টুর বই" একশো সত্তরে বাংলার ফুটবল" থেকে তথ্য সংগৃহীত।) আবার বুলা কাকার (রিন্টুর বাবা) চিকিৎসায় রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল কিন্তু তখন রায়গঞ্জে ব্লাড ব্যাংক ছিল না। বাবা নিজে মালদা থেকে রক্তের ব্যবস্থা করেন। বুলা কাকাকে অবশ্য বাঁচানো যায়নি। বাবার অতিথিদের চাপে আমার মা (নীলিমা) রান্না ঘরেই সারাদিন কাটিয়ে দিত। গোবিন্দ চন্দ্র ঘোষের উত্তর পুরুষদের মধ্যে অধিকাংশই স্বল্পায়ু ছিলেন, শুধু আমাদের ঠাকুরদা যামিনী কান্তই দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। ১৯৬৭ সালের ৫ই জুনের রাত আমার স্মৃতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ওই ভয়ংকর রাতেই সবার সামনে মাত্র ৫০ বছর বয়সে আমাদের অনাথ করে বাবা এ সংসার ছেড়ে চলে গেলেন। এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। বাবার মৃত্যুর পর বাড়ির কালী পূজা বন্ধ হয়ে যায় বাইরের মাঠের দুর্গাপূজা ব্যবসায়ীরা চালু রেখেছে, সামনের দুটি লিচু গাছ কেটে সুন্দর দুর্গা মন্দির বানিয়ে ব্যবসায়ীরা নিত্য পূজার ব্যবস্থা করেছে। আজ একে একে অকালে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে আমার বাবা-মা, কমল (স্বামী) অমিত (ভাই ),শুভ্র (ভাই )ও সীমা (বোন)। কাকা ও কাকিমা পরিণত বয়সেই দেহ ত্যাগ করেছেন। সবার বিচ্ছেদের শোক সইবার জন্য আমি শুধু পড়ে আছি। স্মৃতির আধারে মধুর ও বিষাদে ভরা "আমার প্রিয় বড়বাসার" অভিজ্ঞতার কাহিনীতে এখানেই ইতি টানছি।